September 10, 2026, 7:00 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে প্রশ্নটি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে, তা হলো—আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে আসেন, তাহলে বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে কী অবস্থান নেবে? দলটি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও স্থগিত। কিন্তু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়ন ছাড়া। ফলে কাগজে-কলমে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকছেন না; প্রার্থী হবেন ব্যক্তি।
এই বাস্তবতাতেই আওয়ামী লীগের সাবেক বা বর্তমান নেতাদের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে অংশ নিচ্ছে না। কারণ দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই, দলীয় মনোনয়নও থাকছে না, দলীয় প্রতীকও থাকছে না। তবে আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, তিনি বৈধ প্রার্থী হিসেবে অংশ নিতে পারবেন।
সরকারের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। জাতীয় রাজনীতিতে কোনো দল নিষিদ্ধ বা তার কার্যক্রম সীমিত থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বর্তমান কাঠামোয় কোনো ব্যক্তিকে শুধু তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে না—যদি তিনি নির্বাচনী আইনের অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করেন।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে নেই, কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতীতে যুক্ত কোনো ব্যক্তি ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকতে পারেন—এমন একটি সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকছে।
আর এখানেই স্থানীয় নির্বাচনটি জাতীয় রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
দলীয় প্রতীক না থাকায় ব্যালটে কোনো প্রার্থীর পাশে নৌকা, ধানের শীষ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক থাকবে না। কিন্তু গ্রামের হাট, ইউনিয়নের চায়ের দোকান, বাজার কিংবা উপজেলা সদরের রাজনৈতিক আড্ডায় ভোটের হিসাব যে দলীয় পরিচয়কে ঘিরেই হবে না—এমনটি ভাবার কারণ নেই। স্থানীয় রাজনীতিতে একজন প্রার্থীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগ, স্থানীয় সংগঠন এবং ব্যক্তিগত ভোটভিত্তি অনেক সময় দলীয় প্রতীকের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
ফলে ‘নির্দলীয়’ নির্বাচনের ব্যালট হলেও ভোটের মাঠ পুরোপুরি নির্দলীয় থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিএনপির জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, উপজেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে একজন সমর্থিত প্রার্থী ঠিক করে দিতে পারে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও স্থানীয় বিএনপিকে প্রতিটি ইউনিয়নে একক সমর্থিত প্রার্থী রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এতে স্থানীয় নির্বাচনের মাঠে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। আইনের চোখে প্রার্থীরা হবেন স্বতন্ত্র; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন প্রার্থীকে স্থানীয় বিএনপির সমর্থিত হিসেবে বিবেচনা করবেন ভোটাররা। দলীয় প্রতীক না থাকলেও সেই সমর্থন তার নির্বাচনী প্রচারণা, কর্মী-সমর্থক এবং ভোটের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিএনপির এই কৌশলের পেছনে স্থানীয় ভোটের একটি সরল অঙ্ক কাজ করছে। একই দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিপরীতে একজনকে সমর্থন করলে দলের সমর্থন একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব হয়। ফলে দলীয় প্রতীক না থাকলেও সাংগঠনিক শক্তিকে একজন প্রার্থীর পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত থাকার কারণে দলীয় ব্যানারে কোনো প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতার ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং ভোটভিত্তি রয়েছে। তারা যদি আইনগতভাবে যোগ্য হন এবং ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে আসেন, তাহলে সেই ব্যক্তিগত প্রভাব কতটা কাজে লাগে—সেটিই নির্বাচনের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে অবশ্য একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে বৈধ প্রার্থী হওয়া আর নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের হয়ে সাংগঠনিকভাবে নির্বাচন করা এক বিষয় নয়। কোনো প্রার্থী ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তার আইনগত যোগ্যতা একভাবে বিবেচিত হবে; কিন্তু নিষিদ্ধ সংগঠনের নামে প্রচারণা, সংগঠন পরিচালনা বা দলীয় কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠলে সেটি ভিন্ন আইনি প্রশ্ন তৈরি করবে।
ফলে নির্বাচন কমিশনের সামনে এবার শুধু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট হবে না; নির্বাচনী মাঠে রাজনৈতিক পরিচয় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে প্রশাসন। মীর শাহে আলমের ভাষায়, বৈধ প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তারা যাতে যথাযথভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন, সে জন্য স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ স্থানীয় নির্বাচন এমন একটি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং স্থানীয় পর্যায়ের ভোটব্যাংকের পুনর্বিন্যাস—সবকিছু একসঙ্গে পরীক্ষা হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের ফল স্থানীয় নির্বাচনে হুবহু প্রতিফলিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী ব্যক্তির পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি ইউনিয়নে কোনো প্রার্থী বিএনপির সমর্থন পেলেও তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হলে তিনি জিতবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কোনো সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা দলীয় প্রতীক ছাড়াই দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্থানীয় ভোটভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারেন।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতারাও একই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন। দলীয় প্রতীক না থাকায় জাতীয় পর্যায়ের দলীয় পরিচয় অনেকটাই আড়ালে থাকবে; কিন্তু স্থানীয় সংগঠন ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভোটের মাঠে দৃশ্যমান থাকবে।
এ কারণেই এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু নির্দলীয় নির্বাচন হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। বরং বলা যায়, এবার দলীয় প্রতীক সরিয়ে দিয়ে দলীয় রাজনীতিকে স্থানীয় পর্যায়ে অন্য একটি পথে প্রবাহিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যালটে দল থাকবে না, কিন্তু ভোটারের স্মৃতিতে দল থাকবে। প্রার্থীর রাজনৈতিক অতীত থাকবে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের পরিচয় থাকবে। দলীয় সমর্থন থাকবে। থাকবে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনে আসতে পারবেন কি না—এখানে আটকে নেই। বড় প্রশ্ন হলো, তারা এলে বিএনপি কীভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, স্থানীয় পর্যায়ে তাদের পুরোনো ভোটভিত্তি কতটা সক্রিয় থাকবে, আর নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো সেই জায়গায় কতটা প্রবেশ করতে পারবে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনগত যোগ্যতা থাকা প্রত্যেক বৈধ প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। বিএনপিও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আলাদা কোনো সাংগঠনিক অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে না; বরং নিজেদের পক্ষে স্থানীয়ভাবে একজন করে সমর্থিত প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশল নিচ্ছে।
এর ফলে আগামী স্থানীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। এখানে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নেই, বিএনপি দলীয় প্রতীকে নেই, অন্য দলগুলোরও দলীয় প্রতীক নেই—কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে প্রবল।
শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে কে—তা শুধু দলের জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। স্থানীয় মানুষের কাছে কোন প্রার্থী গ্রহণযোগ্য, কার সামাজিক ভিত্তি শক্ত, কার সংগঠন কার্যকর, কার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ আছে এবং কে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হতে পারে।
তাই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বলা যায় দলীয় প্রতীকহীন এক রাজনৈতিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো ব্যালটের প্রতীকে নয়; হবে মানুষের স্মৃতি, স্থানীয় সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোকে ঘিরে।
আর সেই কারণেই আওয়ামী লীগের নেতারা ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে এলে বিএনপির অবস্থান কী হবে—মীর শাহে আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা স্পষ্ট হলেও, এর প্রকৃত উত্তর মিলবে মাঠের নির্বাচনী লড়াইয়ে।